A few words on Faiz

FaizPic

ফয়েজ আহমেদ্‌ ফয়েজ সম্পর্কে দু চার কথা

ফয়েজ আহমেদ্‌ ফয়েজ – পকিস্থানের প্রবাদ-প্রতিম কবি। অবিভক্ত ভারতবর্ষে ১৯১১ সালে ১৩ই ফেব্রুয়ারী, শিয়ালকোটে এক সম্ভ্রান্ত এবং শিক্ষিত পরিবারে তাঁরজন্ম।বাবা সুলতান মহম্মদ খান তৎকলীন ব্রিটীশ গভর্নমেন্ট এর অধীনে ব্যারিস্টার ছিলেন । ফয়েজের লেখা, তাঁর চিন্তাধারা, তাঁর জীবনকে বুঝতে গেলে তার বাবা সুলতান মহম্মদ, তাঁকে কি ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থারমধ্য দিয়ে গড়ে তুলেছিলেন তা বোঝা প্রয়োজন ।ফয়েজ এক রক্ষণশীল মুসলমান পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন এবং তাঁর পরিবারের ধর্ম-নিরপেক্ষ ঐতিহ্যবাহী ইস্‌লাম প্রথায় বড়হয়েছিলেন । জীবনের প্রথম ভাগে তিনি রক্ষণশীল প্রথায় আরবী, ফারসী, উর্দু এবং কোরান পড়লেও, পরে তাঁর বাবা চেয়েছিলেন ছেলে যেন বিখ্যাত শিক্ষাবিদ স্যর সৈয়দ আহ্‌মাদ খান এর পদাঙ্ক অনুসরণ করেন । বাবার ইচ্ছায় প্রথমে ফয়েজ Scotch Mission School এ, আর ম্যাট্রিক এর পরে Murray College এ Intermediate এ ভর্তি হন । ১৯২৬ সালে তিনি লাহোরে Government College University(GCU) তে Language and Fine Arts department এ বিশেষভাবে ইংরাজি এবং দর্শন নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন । এখানেই তিনি আরবী ভাষার শিক্ষক প্রফেসর মীর হাসান এবং প্রফেসর শামসুল আল্লাম এর সংস্পর্সে আসেন ।  ১৯২৬ সালেফয়েজ আরবী ভাষায় অনার্স নিয়ে B.A. পাস করেন, ১৯৩০ সালে GCU  তেই M.A তে ভর্তি হন এবং ১৯৩২ সালে ইংরাজি সাহিত্য নিয়ে পাস করেন । আর সেই বছরেই পাঞ্জাব ইয়ুনিভারসিটির Oriental College থেকে আরবী সাহিত্যে স্নাতোকক্তর ডিগ্রি পান ।

ছাত্র অবস্থায় থাকাকালীন ফয়েজ এম.এন. রায় এবং মুজফ্ফর আহমেদ এর সংস্পর্শে আসেন এবং এঁদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে, কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হন । ১৯৪১ সালে ফয়েজ কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যা এলিস জর্জ নামের একজন বৃটীশ মহিলাকে বিবাহ করেন ।

রক্ষণশীল মুসলমান পরিবারে বড় হয়ে উঠলেও ফয়েজ নিজেকে অজ্ঞেয়বাদী বা agnostic ভাবতেন । ১৯৩৫ থেকে ১৯৩৭ সাল অবধি ফয়েজ আলিগড়ে  Muhammadan Anglo-Oriental College এ ব্রিটিশ সাহিত্য পড়িয়েছেন, তারপর ১৯৩৭ সালে লাহোরে Hailey College of Commerce এ ইকনোমিকস ও কমার্স পড়িয়েছেন। ১৯৪২ থেকে ১৯৪৭ অবধি ব্রিটিশ আর্মি তে ছিলেন, এবং ১৯৪৭ এ দেশ ভাগ হওয়ার পর তিনি পাকিস্থানের নাগরিকত্ব স্বীকার করেন । কিন্তু ১৯৪৭ এই ভারতের সঙ্গে পাকিস্থানের কাশ্মীর নিয়ে বিবাদ দেখে ফয়েজ মিলিটারির চাকরিতে ইস্তফা দেন ।

এত সবের মাঝে পাশাপাশি চলছিলো ফয়েজের সাহিত্য চর্চা । ১৯৩৮ সালে তিনি “আদাব-এ-লতিফ” নামক একটি উর্দু পত্রিকার প্রধান সম্পাদক হিসাবে কাজ  শুরু করেন; তাঁর প্রথম কবিতার বই “নকস্‌-এ-ফরিয়াদী” (১৯৪৩) এই সময় প্রকাশিত হয় । এছাড়া “দস্ত-এ-সবা” (১৯৫২) এবং “জিন্দন্‌-এ-নামা” (১৯৫৬) তাঁর সব থেকে জনপ্রিয় কবিতার বই । ফয়েজ সবশুদ্ধ আটটি বই লেখেন, এবং চারবার  (মতান্তরে দুবার) নোবেল প্রাইজের জন্য মনোনীত হয়েছিলেন । সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্বের সম্পর্ক ছিলো; ১৯৬২ সালে রাশিয়া তাঁকে “লেনিন পীস প্রাইজ” দিয়ে সম্মানিত করে ।

ফয়েজ  দেশ ভাগের সমর্থন করেননি। দেশ ভাগের প্রতিবাদে তাঁর কবিতা “ ইয়ে দাগ দাগ উজালা “ কবিতাটি তাঁকে বাঙ্গালীর কাছে খুব জনপ্রিয় করে তুলেছিলো । ১৯৫১ সালের ৯ মার্চ, এই বিদ্রোহী কবি এবং আরও কয়েকজন রাওয়ালপিন্ডি কনস্‌পিরেসি কেস এ অভিযুক্ত হয়ে কারারুদ্ধ হন । কারাবাসকালীন ফয়েজ কয়েকটি অনবদ্য কবিতা সৃষ্টি করেন ।

১৯৫৬ সালে সুরাবর্দি প্রধানমন্ত্রী হিসাবে ক্ষমতায় এলে ১৯৫৭ সালে এঁদের কারাদন্ড মওকুফ করেন। ছাড়া পাওয়ার পর ফয়েজ দেশ ছেড়ে লন্ডনে চলে যান এবং ১৯৫৮ সালে স্বদেশে ফিরেআসেন । ফিরে আসার সঙ্গে সঙ্গে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মির্জা তাঁকে কমিউনিস্ট হওয়ার অপরাধে আবার কারারুদ্ধ করেন । এবার যেহেতু তাঁর বন্ধু জুল্‌ফিকার আলী ভুট্টো তাঁর সহায় ছিলেন, ১৯৬০ সালে তিনি আবার ছাড়া পান,  এবং এবার তিনি মস্কো চলে যান – এবং পরে লন্ডনে বসবাস করতে শুরু করেন ।

অনেকে জানেন, আবার অনেকে হয়তো জানেন না যে কবি এবং পত্রকার, ফয়েজ একটি ছবি অর্থাৎ সিনেমার সংলাপরচনা করেন, এমন একটি সময় যখন তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্থানে ছবি তৈ্রী করা অচিন্তনীয় ঘটনা । যে গল্প নিয়ে  এই ছবিটি হয়, তার লেখক বাঙালি সাহিত্যিক মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং উপন্যাসের নাম “পদ্মা নদীর মাঝি” । ফয়েজ তাঁর ছবির সংলাপ ও গান লেখেন । নায়িকার ভূমিকায় অভিনয় করেন শ্রীমতী তৃপ্তি মিত্র।  ফয়েজের বামপন্থী মতবাদের জন্য পাকিস্থান সরকার এই ছবিটির প্রদর্শন বন্ধ করলেও Moscow International Film Festival  এ ছবিটি “Golden Medal” পুরস্কারপায় ।

ফয়েজ আসলে ছিলেন মানবতাবাদের সমর্থকএকজন কবি । সারা জীবন শুধু তিনি দেশ-ভক্তি এবং অসহায় মানুষদের কথাই লিখে গেছেন ।ফয়েজ অনেকবার ঢাকা তে এসেছেন এবং উর্দু কবিতা আবৃত্তি সভায় (মুশায়েরা) অংশগ্রহন করেছেন কিন্তু “লেনিন পীস প্রাইজ” পাওয়ার পরে যখন তিনি ১৯৬৪ সালে ঢাকায় আসেন, তাঁর জন্য যে অভিনন্দন সভার আয়োজনকরা হয়েছিলো, তা অভূতপূর্ব – সভাগৃহে তিল ধারণের জায়গা ছিলোনা – এমন কি বাইরেও নয় ।

বাঙলা দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে পাক সৈ্ন্যরা শুধু সাধারণ নিরপরাধ মানুষদের অবাধে হত্যা করেনি; নিহতদের মধ্যে ছিলেন অনেক কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক এবং ছাত্ররা । বাঙলা দেশের এই নিন্দনীয় ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ করেন পশ্চিম পাকিস্থানের বহু কবি, লেখক এবং রাজনীতিবিদেরা – ফয়েজ তাঁদের মধ্যে একজন । ২৫শে মার্চ, ১৯৭১ এর রাতের শোকাবহ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে শোকার্ত ফয়েজ লিখেছিলেন তাঁর বিখ্যাত কবিতা “hazar karo mere tan se”, Stay away from me.

১৯৭১ এ বাংলা দেশ স্বাধীন হওয়ার পর শেষবার ফয়েজ বাংলা দেশে আসেন । আত্মসমর্পণের দিন সন্ধ্যায় পাকিস্থান আর্মি, প্রফেসর মুনীর চৌধুরী ও শাহিদুল্লাহ কাইসার এবং আরও অনেক বুদ্ধিজীবী কে হত্যা করেছে। বেদনার্ত মন নিয়ে তিনি পাকিস্থানে ফিরে এলে দুটি কবিতা লেখেন । কবিতা দুটি “ঢাকা সে ওয়াপসী” (On return from Dhaka) আর “পাওঁ সে লহু কো ধো ডালো” (Wash the blood from your feet) ইংরাজিতে অনুবাদ করেছেন আজহার হুসেন ।

ভুট্টো যখন বিদেশ-মন্ত্রীর পদ লাভ করেন, তখন ১৯৬৪সালে ফয়েজ আবার দেশে ফিরে আসেন । জেনেরাল জিয়া-উল-হক এর নেতৃত্বে যখন ভুট্টোকে অপসারণ করা হয় এবং কারারুদ্ধ করা হয় ফয়েজ অত্যন্ত দুঃখিত হয়েছিলেন । তাঁরও প্রতিটি চলাফেরার ওপর নজর রাখা হোত । অবশেষে, ১৯৭৯ সালে ভুট্টোর ফাঁসির খবর পেয়ে তিনি আবার দেশত্যাগ করেন । এবার বসতি হলো লেবাননের বেইরুট শহরে ।

১৯৮২ তে লেবাননে যুদ্ধ শুরু হলে, ভগ্নস্বাস্থ্য, ভগ্ন–হৃদয় এই কবি আবার তাঁর স্বদেশে ফিরে এলেন । ১৯৮৪ সালে লাহোরে ৭৩ বছর বয়েসে অসাধারণ প্রতিভার অধিকারী  ফয়েজ আহমেদ ফয়েজের মৃত্যু হয় ।

পাকিস্থানের উর্দু-সাহিত্যে ফয়েজ একটি অতি উজ্বল নাম । পাকিস্থান গভর্নমেন্ট এর কাছ থেকে তিনি ১৯৯০ সালে মরণোত্তর “নিশান-এ-ইমতিয়াজ” পুরষ্কার পেয়েছিলেন ।

** ফয়েজ সম্পর্কিত তথ্য সমূহ ইন্টারনেট এর বিভিন্ন সাইট থেকে আহরণ করা হয়েছে । যদি কোনও ত্রুটি চোখে পড়ে নিশ্চয় জানাবেন, সংশোধন করে দেবো ।

ফয়েজ আহমেদফয়েজ এর নিম্নলিখিত চারটি বই এর থেকে ৫০ টি কবিতা বাংলায় অনুবাদ করা হয়েছে। এই সঙ্গে আরও চারটি অসঙ্কলিত কবিতার অনুবাদও দেওয়া  হল ।

নকশ্-এ-ফরিয়াদি  ( অভিযোগের মানচিত্র – ১ থেকে ১৬ )

 দস্ত্-এ-সবা (বাতাসের হাত – ১৭ থেকে ৩৪ )

জিন্দান-নামা  (কারাগার-নামা  – ৩৫ থেকে ৩৮) এবং

দস্ত্‌-এ-তহ্‌-এ-সংগ্‌ (পাথরের নীচে চাপা পড়া হাত – ৩৯ থেকে ৫০)